আত্মশক্তি ফাউন্ডেশন

যোগ

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে দেহ ও মনের প্রগাঢ় সংযোগই হলো যোগ। কিছু বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে দেহ ও মনের এই সংযোগ করা হয়। এর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিষয় নিয়ে উপস্থাপিত শাস্ত্রই যোগশাস্ত্র নামে পরিচিত।

ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চল ও এর সীমানা ঘেঁষে যে কয়টি প্রাচীন জনপদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তার সবগুলোতেই যোগাসনের বিভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। মেহেড়গড়, মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা সভ্যতার নমুনাগুলো থেকে ধারণা করা যায় যে- যোগাসনের চর্চা ছিল ভারতবর্ষে আর্যদের আসার বহু আগে থেকে। হিসাবের নিরিখে তা প্রায় খ্রিষ্ট-পূর্ব ৫০০০ অব্দেরও আগে আরম্ভ হয়েছিল। এই সকল সভ্যতার ভারতীয় উত্তরপুরুষরাই পরবর্তী সময়ে এক একটি পৃথক শাস্ত্ররূপে পরিবেশন করেছেন মাত্র।

প্রাচীন ভারতের ঋষিরা এই চর্চাকে একটি পরিশীলিত শাস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। সেই কারণে, যোগ শাস্ত্র বলতেই ভারতীয় দর্শনকেই বুঝায়। ভারতীয় ঋষিরা তাঁদের অধ্যাত্ম চর্চার জন্য ধ্যানস্থ হতেন। ঋষিরা মনে করতেন, পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনই হলো যোগ। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীগুলো থেকে জানা যায়, এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই তাঁরা তাঁদের সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতেন। যোগবলে তাঁরা যে অসাধ্য সাধন করতে পারতেন, তার বর্ণনা পাওয়া যায় হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীগুলিতে।

অষ্টাঙ্গ যোগ

ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে পতঞ্জলি নামক জনৈক ঋষি যোগসূত্রগুলো একত্রিত করে, একটি পৃথক শাস্ত্রে রূপ দেন। এই সঙ্কলনে সূত্র রয়েছে ১৯৫টি। এই সূত্রগুলো আটটি অঙ্গে বিভক্ত। এই কারণে একে অষ্টাঙ্গ বলা হয়। এই অঙ্গগুলো হলো- যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। 

পতঞ্জলি যোগসূত্রগুলোকে চারটি পাদে বিভক্ত করেছিলেন। এই পাদগুলো হলো— যোগপাদ, সাধনপাদ, বিভূতিপাদ ও কৈবল্যপাদ।

১। যম (Yama)

অহিংসা (Ahimsâ) – কারও অনিষ্ট না করা, মনে মনে কারও অনিষ্ট চিন্তা না করা। কাউকে কটু কথা না বলা, কারও মনে আঘাত না দেওয়া এবং কোন প্রাণীর প্রতি হিংসা প্রদর্শন না করাই হলো অহিংসা।

সত্য (Satya) – যা দেখেছি যা শুনেছি, ঠিক তেমনভাবেই তার বর্ণনা করা, কারও সাথে কপটতা না করা, এবং যে কথা অপরের মনে আঘাত হানে তেমন কথা না বলাই হলো সত্য।

অস্তেয় (Asteya) – অপরের জিনিস না বলে নেওয়া, অপরের জিনিসের প্রতি লোভ করা, অস্ত্রের সাহায্যে বা ভীতি প্রদর্শন করে অপরের বস্তু আত্মসাৎ করাকে বলে চুরি। আর চুরি না করাকেই বলে অস্তেয়।

ব্রহ্মবর্য (Brahmacharya) – দর্শন, স্পর্শন, একান্তসেবন, ভাষণ, বৈষয়িক কথা, পরস্পর ক্রীড়া, বিষয়ের ধ্যান ও সঙ্গ – এই আটপ্রকার কাজ থেকে দূরে থাকা বা এতে আসক্ত না হওয়ার প্রচেষ্টাই হলো ব্রহ্মচর্য।

অপরিগ্রহ (Aparigraha) – পরিগ্রহের অর্থ হলো চারদিক থেকে সংগ্রহ করার চেষ্টা। আর অপরিগ্রহের অর্থ ঠিক এর বিপরীত। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অর্থ, বস্ত্র ইত্যাদি যতটুকু প্রয়োজন ঠিক সেটুকু পেয়েই সন্তুষ্ট থাকাকেই বলে অপরিগ্রহ।

২। নিয়ম (Niyama)

শৌচ (Shoucha) – শৌচ শব্দের অর্থ হলো শুদ্ধতা বা পবিত্রতা। একজন যোগীকে প্রতিদিন জল দ্বারা শরীর শুদ্ধি, সত্য আচরণ দ্বারা মনের শুদ্ধি, বিদ্যা ও তপ দ্বারা আত্মার শুদ্ধি এবং জ্ঞান দ্বারা বুদ্ধির শুদ্ধি করতে হয়। 

সন্তোষ (Santosha) – যা প্রাপ্ত হয়নি তা নিয়ে না ভেবে নিজের প্রচেষ্টায় যা প্রাপ্ত হয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকার নাম সন্তোষ। অর্থ ও ইন্দ্রিয়ভোগের লালসা কখনো সুখ দিতে পারে না। তাই অর্থ ও ইন্দ্রিয়ভোগের জন্য ছুটাছুটি না করে নিজ প্রচেষ্টায় প্রাপ্ত বস্তুতেই সন্তুষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়। এতেই প্রকৃত সুখ প্রাপ্ত হয়।

তপ (Tapa) – আমাদের জীবনে চলার পথে নানারূপ বাধা-বিপত্তি আসবে, এটা অবশ্যম্ভাবী। যারা সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, মান-অপমান, নিন্দা-প্রশংসা, সৎকার-তিরস্কার, ঠাণ্ডা-গরম সকল পরিস্থিতিতেই অবিচলিত থাকেন, তারাই জয়ী হন। একেই তপ বলে। 

স্বাধ্যায় (Swadhyaya) – বেদ, উপনিষদ, গীতা, যোগদর্শন প্রভৃতি সত্যশাস্ত্র শ্রদ্ধার সঙ্গে নিয়মিত অধ্যয়ন করাকে স্বাধ্যায় বলে। 

ঈশ্বর প্রণিধান (Ishwara Pranidhana) – আমাদের জীবনে শরীর, মন, বুদ্ধি, শক্তি, রূপ, যৌবন, সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্য, পদ, শাসন-ক্ষমতা, সম্মান প্রভৃতি সম্পদ যা আমরা পাই তা সব ঈশ্বরের কাছ থেকেই পাই। আমি যা কিছু পেয়েছি তা সব ঈশ্বরের পায়েই সমর্পণ করব – এই প্রচেষ্টা বা মানসিক অনুভূতিই হলো ঈশ্বর প্রণিধান। ‘ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব। ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব। ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব। ত্বমেব সর্বং মম দেবদেব।’ অর্থাৎ তুমিই আমার মাতা, পিতা ও বন্ধু, আমার যা কিছু বিদ্যা ও সম্পদ আছে তা সবই তোমার। আমার বলতে শুধু তুমিই আছ। এই অনুভূতিই ঈশ্বর প্রণিধান। 

৩। আসন

বিবিধ প্রকার আসন রয়েছে।

৪। প্রাণায়াম

বিবিধ প্রকার প্রাণায়াম রয়েছে। এর মধ্যে মুখ্য কয়েকটি প্রাণায়াম হলো ভস্ত্রিকা, কপালভাতি, অনুলোম বিলোম বা নাড়ীশোধন, উজ্জায়ী, ভ্রামরী ইত্যাদি। 

৫। প্রত্যাহার

৬। ধারণা

৭। ধ্যান

৮। সমাধি